বুলিং ও বডি শেমিং: আমাদের সন্তানেরা কি আসলেই স্কুলে নিরাপদ?

ভোরবেলা যখন সাত বা আট বছরের ছোট্ট শিশুটির পিঠে ওজনের ভারে নুয়ে পড়া স্কুলব্যাগটি তুলে দেন মা, তখন তার মনে একরাশ স্বপ্ন থাকে। তিনি ভাবেন, তিনি তার সন্তানকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে পাঠাচ্ছেন, মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু সেই মা কি জানেন, স্কুলের গেট পেরোনোর পর তার আদরের সন্তানটি কেবল ক্লাসরুমেই প্রবেশ করছে না, বরং প্রবেশ করছে এক অলিখিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্রে? যেখানে তাকে হয়তো লড়াই করতে হয় তার গায়ের রং নিয়ে, তার শরীরের গঠন নিয়ে, কিংবা তার কথা বলার ধরণ নিয়ে। বাংলাদেশে স্কুল-কলেজগুলোতে ‘বুলিং’ এবং ‘বডি শেমিং’ এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি নীরব মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়। আমরা যখন পত্রিকার পাতা উল্টাই, তখন হয়তো আত্মহত্যার দু-একটি খবর আমাদের চোখে পড়ে, আমরা সাময়িক আক্ষেপ করি। কিন্তু যেই হাজারো শিশু প্রতিদিন অপমানে, লজ্জায়, সতীর্থদের টিটকারিতে নিজের ভেতরে একটু একটু করে মরে যাচ্ছে, তাদের বোবা কান্নার খবর আমরা কজন রাখি? আজকের এই লেখাটি সেই সব না বলা গল্পের দলিল এবং এই অন্ধকার থেকে আমাদের সন্তানদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনার একটি মানবিক প্রচেষ্টা।
আমাদের সমাজে একটা খুব ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। ক্লাসের কোনো বন্ধুকে ‘কালি’, ‘মটুকু’, ‘জিরাফ’ বা ‘বইয়ের পোকা’ বলে ডাকাটাকে আমরা অনেকেই ‘নিছক দুষ্টুমি’ বা ‘বন্ধুদের ইয়ার্কি’ বলে উড়িয়ে দিই। অভিভাবকরাও অনেক সময় বলেন, “বন্ধুরা একটু মজা করেছে, এতে মন খারাপের কী আছে?” কিন্তু এই ইয়ার্কি যখন বারবার করা হয়, যখন কাউকে ছোট করার উদ্দেশ্যে, মানসিকভাবে আঘাত করার উদ্দেশ্যে দলবেঁধে করা হয়, তখন সেটা আর দুষ্টুমি থাকে না; সেটা হয়ে যায় ‘বুলিং’। বুলিং কেবল মারধর করা বা টিফিন কেড়ে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ইচ্ছাকৃত ধাক্কা দেওয়া, ক্লাসের সবার সামনে কোনো শারীরিক খুঁত নিয়ে হাসাহাসি করা, বা কোনো কারণ ছাড়াই কাউকে একঘরে করে দেওয়া—এ সবই বুলিংয়ের অংশ। আর যখন কারো শারীরিক গঠন, গায়ের রং, উচ্চতা বা ওজন নিয়ে কটু কথা বলা হয়, তখন তাকে বলা হয় বডি শেমিং। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বডি শেমিং অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমাদের সামাজিক কাঠামোতে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মনে গেঁথে দেওয়া হয় যে, ফর্সা মানেই সুন্দর, আর কালো মানেই অসুন্দর; চিকন মানেই স্মার্ট, আর একটু স্বাস্থ্যবান হলেই সে হাসির পাত্র। এই বর্ণবাদী ও শরীরকেন্দ্রিক বিচারবিবেচনা শিশুদের মনোজগৎকে বিষাক্ত করে তুলছে।
আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে গা শিউরে ওঠে। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, ২০১৮ সালের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সেই মর্মান্তিক ঘটনাটির কথা আমাদের সবার মনে আছে। নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী, যে শিক্ষকের অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। অরিত্রীর সেই চলে যাওয়া আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, আমাদের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের কতটা অবনতি হয়েছে। এরপর যদি আমরা তাকাই বুয়েটের আবরার ফাহাদের ঘটনার দিকে, যদিও সেটি একটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল এবং এর প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কিন্তু এর মূলে ছিল ‘র‍্যাগিং’ বা সিনিয়রদের দ্বারা জুনিয়রদের বুলিং করার এক পৈশাচিক সংস্কৃতি। র‍্যাগিং বুলিংয়েরই এক চরম এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, যা আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে আছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার নামকরা স্কুলগুলো থেকে শুরু করে মফস্বলের কলেজ—সবখানেই বুলিংয়ের অভিযোগ উঠছে। এখনকার দিনে এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অভিশাপ। সহপাঠীরা একে অপরকে নিয়ে ফেসবুকে ‘কনফেশন পেজ’ বা গোপন গ্রুপ খুলে সেখানে নোংরা ট্রল বা সাইবার বুলিং করছে। এই ডিজিটাল বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক কিশোর-কিশোরী ঘরকুনো হয়ে যাচ্ছে, লোকলজ্জার ভয়ে তারা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে, এমনকি আত্মহননের মতো ভয়ংকর চিন্তাও তাদের মাথায় আসছে।
বুলিং বা বডি শেমিংয়ের প্রভাব কেবল সাময়িক মন খারাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি একটি শিশুর পুরো জীবনকে, তার ভবিষ্যৎকে ওলট-পালট করে দিতে পারে। এই যে দিনের পর দিন অপমান, এর প্রভাবটা কত গভীর, তা আমরা বড়রা অনেক সময় কল্পনাও করতে পারি না। প্রথমেই যেটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তা হলো শিশুটির আত্মবিশ্বাস। যখন একটি শিশুকে প্রতিদিন শুনতে হয় যে সে দেখতে ভালো নয়, বা সে অন্যদের মতো স্মার্ট নয়, তখন ধীরে ধীরে সে সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করে। তার মনে হয়, “হয়তো আমি আসলেই অযোগ্য, আমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না।” এই হীনম্মন্যতা তাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায়। সে ক্লাসে পড়া পারলেও হাত তুলতে ভয় পায়, স্টেজে উঠতে ভয় পায়, এমনকি নতুন মানুষের সাথে কথা বলতেও জড়তা বোধ করে। আত্মবিশ্বাস যখন নড়বড়ে হয়ে যায়, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ক্লাসের রেজাল্টে। যে শিশুটি স্কুলে যাওয়ার নাম শুনলেই আতঙ্কে থাকে, তার পক্ষে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। বুলিংয়ের শিকার শিশুদের রেজাল্ট হঠাৎ করে খারাপ হতে শুরু করে, তারা স্কুলে যেতে চায় না, ঘন ঘন অসুস্থতার ভান করে। অভিভাবকরা ভাবেন সন্তান ফাঁকিবাজ হয়েছে, তাকে বকাবকি করেন, কিন্তু আসল কারণটা যে স্কুলের করিডরে লুকিয়ে থাকা ভয়, সেটা তারা বুঝতেই পারেন না।
দীর্ঘদিন ধরে বুলিংয়ের শিকার হওয়া শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যে বিপর্যয় নেমে আসে তা অপূরণীয়। তাদের মধ্যে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন এবং অকারণে উদ্বিগ্ন থাকার সমস্যা দেখা দেয়। তাদের ঘুমের সমস্যা হয়, দুঃস্বপ্ন দেখে, খাওয়া-দাওয়ায় অরুচি তৈরি হয়। কিশোর বয়সে এই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকে ড্রাগ বা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে, আবার অনেকে বেছে নেয় আত্মহত্যার মতো চূড়ান্ত পথ। মনের এই চাপ শরীরের ওপরও প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা থেকে শিশুদের পেটে ব্যথা, তীব্র মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব—এগুলো দেখা দেয়, যা আসলে কোনো শারীরিক রোগ নয়, বরং মনের ভেতর জমে থাকা ভয়ের শারীরিক বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে বডি শেমিং মারাত্মক প্রভাব ফেলে। “তুই তো মোটা হয়ে যাচ্ছিস” বা “তোর গায়ের রং তো ময়লা”—এই কথাগুলো শোনার পর অনেক কিশোরী খাওয়া কমিয়ে দেয়। এর ফলে অ্যানোরেক্সিয়া বা বুলিমিয়ার মতো ইটিং ডিসঅর্ডার তৈরি হয়। তারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ঘৃণা করতে শেখে, নিজের শরীরকে শাস্তি দিতে শুরু করে। এছাড়া আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো, বুলিংয়ের শিকার শিশুটি অনেক সময় নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে বা মনের ক্ষোভ মেটাতে পাল্টা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যারা ছোটবেলায় বুলিংয়ের শিকার হয়েছে, বড় হয়ে তাদের মধ্যে অনেকেই অপরাধপ্রবণ বা অন্যের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অর্থাৎ, একজন ভিক্টিম পরবর্তী সময়ে একজন অ্যাবউজারে পরিণত হতে পারে, যা সমাজের জন্য অশনিসংকেত।
খুব দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে অনেক সময় শিক্ষকরাই বুলিংয়ের সূচনা করেন, কিংবা জেনেও না জানার ভান করেন। ক্লাসে পড়া না পারলে “গাধা”, “গরু”, “তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না”, “তোর বাপ-মা কি তোকে কিছুই শেখায়নি?”—এই ধরনের অপমানজনক কথাগুলো শিক্ষকদের মুখে অহরহ শোনা যায়। যখন একজন শিক্ষক ক্লাসের সবার সামনে একটি ছাত্রকে অপমান করেন, তখন বাকি ছাত্ররা সাহস পায় সেই ছাত্রটিকে টিটকারি করার। শিক্ষক যা করেন, ছাত্ররা তাকেই বৈধ মনে করে। শিক্ষকের এই আচরণ পরোক্ষভাবে ক্লাসে বুলিংকে উসকে দেয়। অন্যদিকে, পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনও কম যান না। কোনো পারিবারিক দাওয়াতে গেলে কিশোর-কিশোরীদের শুনতে হয়, “কিরে, তুই তো আরো কালো হয়েছিস”, বা “তোর তো শুধু লম্বাই বাড়ছে, বুদ্ধি তো বাড়ছে না।” নিজেদের অজান্তেই আমরা আমাদের শিশুদের বডি শেমিং করছি। অভিভাবকরা যখন সন্তানের তুলনা করেন—“অমুকের ছেলে ফার্স্ট হয়েছে, আর তুই পাস করতে পারিস না”—তখন এটাও এক ধরণের মানসিক নির্যাতন। এই তুলনামূলক মনোভাব শিশুর মনে ঈর্ষা এবং হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়, যা তাকে বুলিংয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বর্তমান সময়ে বুলিং আর স্কুলের মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্মার্টফোনের যুগে বুলিং এখন পকেটে পকেটে ঘোরে। ফেসবুকে বা মেসেঞ্জার গ্রুপে কোনো ছাত্র বা ছাত্রীর ছবি বিকৃত করা, তাকে নিয়ে গুজব ছড়ানো, বা তার ব্যক্তিগত মুহূর্ত ভাইরাল করে দেওয়ার হুমকি—এগুলো এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। অনলাইনে এই অপমান ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত, আর ইন্টারনেটের মেমোরি থেকে তা মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব। ফলে ভিক্টিম শিশুটি মনে করে তার পালানোর কোনো জায়গা নেই, পৃথিবীটা তার জন্য ছোট হয়ে আসছে।
সমস্যা যত গভীরই হোক, এর থেকে উত্তরণের পথ অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। এই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে হলে সবকিছুর শুরুটা হতে হবে ঘর থেকেই। বাবা-মাকে শেখাতে হবে যে, পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া বেশি জরুরি। সন্তানকে শেখাতে হবে অন্যকে সম্মান করতে। “কাউকে তার গায়ের রং, ধর্ম বা শারীরিক গঠন নিয়ে কথা বলা অসভ্যতা এবং অপরাধ”—এই শিক্ষাটা ডাইনিং টেবিলে বসেই দিতে হবে। পাশাপাশি, সন্তান যদি স্কুল থেকে ফিরে মন খারাপ করে থাকে, তবে তাকে ধমক না দিয়ে বন্ধুর মতো তার কথা শুনতে হবে। সন্তান যেন নির্ভয়ে বলতে পারে যে কেউ তাকে বিরক্ত করছে।
ঘরের শিক্ষাটা যখন স্কুলে গিয়ে হোঁচট খায়, তখন সব আয়োজন বৃথা হয়ে যায়। তাই স্কুল-কলেজগুলোতেও পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুলিংয়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি থাকতে হবে। হাইকোর্টের একটি স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে প্রতিটি স্কুলে ‘অ্যান্টি-বুলিং কমিটি’ গঠন করার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অধিকাংশ স্কুলেই এটি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। এটি কার্যকর করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য অভিযোগ বাক্স থাকতে হবে যেখানে তারা নাম গোপন রেখে অভিযোগ করতে পারে এবং কর্তৃপক্ষকে সেই অভিযোগ আমলে নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষকদের বুঝতে হবে যে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ হলেও মানসিক শাস্তি বা অপমান তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা শিশুদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারেন এবং ক্লাসরুমকে ভয়ের জায়গা না করে আনন্দের জায়গায় পরিণত করতে পারেন। প্রতিটি স্কুলে অন্তত একজন পেশাদার কাউন্সিলর বা মনোবিজ্ঞানী থাকা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন, যার কাছে গিয়ে শিক্ষার্থীরা মন খুলে কথা বলতে পারবে।
এছাড়া সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের বোঝাতে হবে যে অনলাইনে কাউকে অপমান করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এর ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে। পাঠ্যবইয়ে কেবল বিজ্ঞান বা অংক নয়, ‘মানবিক মূল্যবোধ’ ও ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বিষয়ক অধ্যায় বা চর্চা যুক্ত করতে হবে। সহমর্মিতা বা এমপ্যাথি কী, অর্থাৎ অন্যের কষ্টটা নিজের অনুভব করার ক্ষমতা—সেটা ক্লাসরুমে প্র্যাকটিস করাতে হবে।
আমরা একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে নেমেছি। জিপিএ-৫, গোল্ডেন এ-প্লাস, মেডিকেল-বুয়েটে চান্স পাওয়ার নেশায় আমরা ভুলে যাচ্ছি যে আমাদের সন্তানেরা রোবট নয়, তারা রক্ত-মাংসের মানুষ। তাদের আবেগ আছে, অনুভূতি আছে, কষ্ট আছে। একটা শিশু যখন স্কুলে যায়, সে যেন ভয়ের রাজ্যে না যায়, বরং আনন্দের রাজ্যে যায়—এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমার, আপনার, এবং আমাদের সবার। বুলিংয়ের কারণে ঝরে পড়া প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি স্বপ্ন আমাদের সমাজের ব্যর্থতা। আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি—আমাদের কোনো কথার আঘাতে যেন কারো চোখ ভিজে না ওঠে। আমাদের কোনো আচরণের কারণে যেন কেউ নিজেকে ছোট না ভাবে। আমাদের সন্তানেরা শিখুক, পৃথিবীটা অনেক বড়, আর এখানে ফর্সা-কালো, মোটা-চিকন নির্বিশেষে সবারই সমান অধিকার আছে মাথা উঁচু করে বাঁচার। দিনশেষে, একটি ভালো রেজাল্ট কার্ডের চেয়ে একটি সুস্থ ও সুন্দর মনের মানুষ অনেক বেশি জরুরি। বুলিং ও বডি শেমিং মুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়ার কাজটা আজ, এখন থেকেই শুরু হোক।