ঈশ্বরদীর মা কুকুর আর আমাদের সমাজের আয়না

ঈশ্বরদীর সেই ভিডিওটা অনেকেই দেখেছেন। রাতের অন্ধকারে বা ভোরের নিস্তব্ধ রাস্তায় একটা মা কুকুর পাগলের মতো এদিক–ওদিক ছুটছে, বুক ফুলে আছে দুধে, আর মুখ ভরা আর্তনাদ। সে জানে না, তার সদ্যজাত বাচ্চাগুলোর আর কেউ নেই। গায়ে–গাছে, ডাস্টবিনের পাশে, কোয়ার্টারের নিচে – যেখানে যেখানে বাচ্চাগুলোকে সে আগেও লুকিয়ে রেখেছে, সবখানে গিয়ে গন্ধ শুঁকে, আবার ফিরে আসছে। কেউ তাকে ভাষায় বোঝায়নি, কিন্তু সে বুঝে গেছে, কোনো বড় বিপদ হয়েছে।

পরে জানা গেল, সেই আটটা কুকুরছানাকে নাকি বস্তায় ভরে পাশের পানিতে ডুবিয়ে মারা হয়েছে। কারণ? “বাচ্চা বেশি হয়ে গেছে”, “বাচ্চাগুলো নোংরা করবে”, “রাতে ঘেউ ঘেউ করবে” – এই ধরনের অজুহাতই সাধারণত শোনা যায়। যে মানুষটা এই কাজ করেছে, সে আমাদেরই সমাজের মানুষ, আশপাশের বাড়ির কেউ, অফিসের কারও পরিবার। অর্থাৎ এটা কোনো দূরের ঘটনা নয়; আমাদের চারপাশেই এমন ভাবনা গড়ে উঠছে, এমন নিষ্ঠুরতা ঘটছে।

কিন্তু এই গল্পের ভেতরেই আরেকটা গল্প আছে। সেই মা কুকুরের কান্না শুনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখে, কিছু মানুষ চুপ থাকতে পারেননি। কেউ ঢাকা থেকে, কেউ স্থানীয়ভাবে এগিয়ে গেছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ডাক্তার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার অফিসার, স্থানীয় সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ – অনেকেই মিলেমিশে চেষ্টা করেছেন যেন এটা “অতি সামান্য” ঘটনা বলে উড়িয়ে না দেওয়া হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে, কাগজপত্র তৈরি করে, আইনের ধারা মিলিয়ে অবশেষে থানায় মামলা নেয়া হয়েছে – এই খবরটাও এসেছে বাইরে।

একদিকে এক মুঠো মানুষ প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন একটা মায়ের আর্তনাদকে গুরুত্ব দিতে, অন্যদিকে আমাদের সমাজের এক অংশ ভাবছে – “আরে, কুকুরের বাচ্চা, এত কথা বানাচ্ছে কেন?” এই দুই মনের টানাপোড়েনটাই আসলে আজকের বাংলাদেশের আয়না। আমরা কোন দিকে যাব, সেটাই এখন ঠিক করার সময়।

আইন আছে, কিন্তু কার জন্য আর কীভাবে?

বাংলাদেশে প্রাণীকে নির্যাতন করা নিষিদ্ধ – এই কথাটা অনেকেই জানেন না। অনেকে তো এখনও ভাবে, পশু–পাখি মানেই “জিনিস”, ইচ্ছামতো মারলেও, শাস্তি হবে কেন? অথচ আমাদের দেশে অনেক পুরোনো একটা আইন ছিল, ব্রিটিশ আমলের – যেখানে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণকে অপরাধ ধরা হয়েছিল। সেই পুরোনো আইনটা বদলে কয়েক বছর আগে নতুন একটা আইন হয়েছে – প্রাণী কল্যাণ আইন। কাগজে–কলমে এটা বেশ অগ্রসর মানসিকতার আইন।

এই নতুন আইনে খুব স্পষ্ট করে বলা আছে – কোনো প্রাণীকে অকারণে মারধর, ক্ষতবিক্ষত, অঙ্গহানি, ইচ্ছা করে না খাইয়ে ক্ষুধার্ত রাখা, জল না দেয়া, পুড়িয়ে ফেলা, বিষ খাওয়ানো – এগুলো অপরাধ। প্রাণী বলতে শুধু গরু–ছাগল–মুরগি না, কুকুর–বিড়াল–পাখি–ঘোড়া – সবই এর ভেতরে পড়ে। আইন আলাদা করে “পোষা প্রাণী” আর “মালিকবিহীন বা পথের প্রাণী” – দুই ধরনের প্রাণীর কথাও ধরে। অর্থাৎ রাস্তার কুকুর–বিড়ালকে কেউ মেরে ফেললেই যে, “এটা তো কারও ছিল না” বলে ছাড় পাওয়া যাবে, সেই সুযোগ রাখেনি আইন।

আইনে আরও একটা বড় বিষয় আছে – মালিকবিহীন প্রাণী, যেমন রাস্তার কুকুর–বিড়াল, এদের “জায়গা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে” মারার বা উধাও করারও সুযোগ খুব সীমিত করে দেয়া হয়েছে। অসুস্থ, পাগলা, মানুষের জন্য সরাসরি বিপজ্জনক – এই ধরনের কিছু বিশেষ অবস্থায়, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে, ব্যথাহীনভাবে মৃত্যু ঘটানোর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু “ঝামেলা কমানোর জন্য রাস্তা থেকে কুকুর উধাও করে ফেলি” – এমন চিন্তাকে স্পষ্টভাবেই বেআইনি বলে রেখেছে আইন।

শুধু এতেই শেষ না, প্রাণীকে ইচ্ছা করে গাড়ির পেছনে বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়া, লাঠি দিয়ে মারতে মারতে হাঁটানো, বাজারে বিক্রির আগে গাদাগাদি করে ট্রাকে তোলা – এই সব কাজকেও আইন প্রাণীর ওপর নিষ্ঠুর আচরণ হিসেবে ধরেছে। কৃষি কাজ বা ব্যবসার স্বার্থে পশু ব্যবহার করতেই হবে – সেটা বুঝেই আইন করা হয়েছে, কিন্তু সেখানেও “অকারণ কষ্ট” দেয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কাগজ পড়ে মনে হতে পারে, বেশ শক্ত আইন। শাস্তি হিসেবে কারাদণ্ড, জরিমানা – দুটোই রাখা আছে। পুনরাবৃত্তি করলে সাজা বাড়ার কথাও বলা আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই আইনটা হাতে নিয়ে মাঠে নামার সুযোগ সাধারণ মানুষের নেই।

সাধারণ মানুষ চাইলে মামলা করতে পারেন না কেন?

প্রাণী কল্যাণ আইনটা পড়লে একটা জটিল জায়গা চোখে পড়ে। সেখানে বলা আছে, এই আইনের অধীনে কোনো মামলা আদালত নেবে তখনই, যখন নির্দিষ্ট “কর্তৃপক্ষ” লিখিত অভিযোগ করবে। এই “কর্তৃপক্ষ” কারা? মূলত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, আর তাঁর ক্ষমতায়ন করা কিছু ভেটেরিনারি সার্জন বা কর্মকর্তা। মানে, আপনি বা আমি রাস্তায় কাউকে কুকুর মারতে দেখে থানায় গিয়ে এই আইনে মামলা করতে চাইলে, সরাসরি তা সম্ভব না – আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা লিখিত অভিযোগ করবেন, তারপর মামলা আদালতে যাবে।

এই একটা ধারাই প্রাণী কল্যাণ আইনকে মাঠে ব্যবহার করা কঠিন করে তুলেছে। ধরা যাক, আপনি গ্রামে আছেন, পাশের বাড়ির লোক ঘৃণা থেকে কোনো পথের কুকুরছানাকে গলা কেটে মেরে ফেলল। আপনি নিজের চোখে দেখলেন। ফোন দিলেন থানায় – ওরা বলল, “আমাদের হাতে তো এই আইনে তেমন করার কিছু নেই, আগে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের লোকদের আনুন।” আপনি গেলেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে, ওখানে হয়তো লোক কম, কেউ মাঠে, কেউ মিটিংয়ে, কেউ আবার মানসিকতা থেকেই বললেন – “এতো কুকুরের জন্য আবার মামলা হবে নাকি!” শেষ পর্যন্ত আপনি হয় ক্লান্ত হয়ে যাবেন, নয়তো ঝামেলার ভয়ে চুপ করে যাবেন। অপরাধীও বাঁচবে।

ঈশ্বরদীর ঘটনায় একটু অন্য রকম কিছু ঘটেছে। এখানে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কিন্তু পিছিয়ে যাননি। তাঁরা ভিডিও দেখেছেন, ঘটনাস্থলে গেছেন, আইনের ফাঁক–ফোকর জেনেও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস, প্রাণিসম্পদ অফিস, থানা – একটার পর একটা দরজায় কড়া নেড়েছে প্রাণিপ্রেমী মানুষজন। অবশেষে আইনজীবীদের পরামর্শ নিয়ে, পুলিশরা পথ খুঁজেছে – কোন ধারা ব্যবহার করলে অন্তত একটা মামলা দাঁড় করানো যায়।

শুনেছি, নানা হিসাব–নিকাশ শেষে তারা সরাসরি প্রাণী কল্যাণ আইনের বদলে বহু পুরোনো দণ্ডবিধির একটা ধারার আশ্রয় নিয়েছে। সেই ধারায় বলা আছে, কেউ যদি ইচ্ছে করে কোনো প্রাণীকে মেরে ফেলে বা এতটাই ক্ষতি করে যে আর কোনো কাজেই লাগে না, আর সেই প্রাণীটার আর্থিক মূল্য একটা নির্দিষ্ট টাকার বেশি ধরা যায়, তাহলে তাকে কারাদণ্ড ও জরিমানা – দুই দিক থেকেই শাস্তি দেয়া সম্ভব। এই ধারাটার মূল সমস্যা হলো, সেখানে প্রাণীকে “সম্পদ” হিসেবে দেখা – তার আর্থিক মূল্য প্রমাণ করতে হয়। রাস্তার কুকুর–বিড়ালের কি দাম লিখবেন? কাকে ডাকবেন, কে মূল্য নির্ধারণ করবেন? বাস্তবে আদালতে গিয়ে এই প্রমাণ হাজির করা খুব কঠিন।

তারপরও ঈশ্বরদীর মানুষজন, প্রাণিসম্পদ বিভাগের ডাক্তার, ইউএনও, ওসি–এসপি – যারা যারা ছিলেন – তারা অন্তত একটা দরজা খোলার চেষ্টা করেছেন। এটাই আশার কথা। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, সাধারণ মানুষের হাতে যদি আইনটা ব্যবহার করার সহজ রাস্তা না থাকে, তাহলে বেশিরভাগ ঘটনায় অপরাধীরা অনায়াসে পার পেয়ে যাবে।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই – এই ফাঁক কোথায়?

আমাদের দেশে অনেক আইন আছে, যেগুলো কাগজে দারুণ, কিন্তু মাঠে খুব কমই কাজ করে। প্রাণী কল্যাণ আইনও ঠিক সেই কাতারে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। বড় দুইটা ফাঁক মোটামুটি স্পষ্ট।

প্রথমত, আইনটা প্রাণীর স্বার্থ রক্ষা করার কথা বললেও, তার প্রয়োগের ক্ষমতা পুরোটা তুলে দিয়েছে একদম সীমিত কিছু সরকারি কর্মকর্তার হাতে। দেশের সব উপজেলা, শহর, গ্রাম – এত জায়গায় কীভাবে প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনার খবর সেই কর্মকর্তা পাবেন? অনেক সময় আমাদের সরকারি দপ্তরগুলো নিজেই জনবল সংকটে ভোগে, ফিল্ডে নামার মতো গাড়ি–কর্মী–সময় – কিছুই ঠিকঠাক থাকে না। তার ওপরে যদি গণমানুষের খুব একটা দাবি না থাকে, তাহলে এমনিতেই “কুকুর–বিড়াল নিয়ে এত তাড়াহুড়ো কীসের?” – এই মানসিকতা কাজ করে।

দ্বিতীয়ত, আইনে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, এইসব অপরাধকে খুব গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখা হবে না। অর্থাৎ পুলিশ সাধারণত নিজে থেকেই দ্রুত গ্রেপ্তার করতে পারবে না, অভিযোগ আসবে, কাগজপত্র হবে, পরে আইনি প্রক্রিয়া এগোবে – আর এর মাঝে প্রায়ই সব ঠান্ডা হয়ে যায়। যে মানুষটা গলা কেটে বিড়াল মেরেছে বা বস্তায় ভরে কুকুরছানা ডুবিয়ে দিয়েছে, সে জানে – সর্বোচ্চ কিছুদিন থানায় যাতায়াত, হয়তো সামান্য জরিমানা, তারপর আবার স্বাভাবিক জীবন। এরকম শাস্তি আসলে কাউকে খুব ভয় দেখায় না।

এর সঙ্গে আছে সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্ন। পুলিশ বা অন্য কোনো কর্মকর্তা যখন দেখেন আশেপাশের বেশিরভাগ মানুষই বলছে – “আচ্ছা, কুকুরটা মেরেছে তো কী হয়েছে? মানুষ মরে, ওসব দেখো” – তখন তাঁর পক্ষেও আলাদা করে দাঁড়ানো কঠিন হয়। আইন কাগজে যত শক্তই হোক, সমাজের মানসিকতা দুর্বল থাকলে সেই আইন অস্ত্র হয়ে ওঠে না।

এই নির্মমতা বারবার কেন ঘটছে?

ঈশ্বরদী, বগুড়া, চট্টগ্রাম, ঢাকা – এখানকার একেকটা ঘটনা মাঝে মাঝে আমাদের সামনে আসে। কোথাও দেখা যায়, কেউ শান্তভাবে বিড়ালকে ডেকে নিয়ে গিয়ে জবাই করছে। কোথাও দেখা যায়, বিষ মিশিয়ে পুরো পাড়ার কুকুর–বিড়াল শেষ করে দেয়া হয়েছে। আবার কোথাও গরু বা ছাগলকে এমনভাবে বেঁধে রাখা হয়, বা এত ওজনের গাড়ি টানানো হয়, যে প্রাণীগুলো শ্বাস নিতে না পেরে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়।

আমরা ভাবি – “এগুলো আলাদা আলাদা ঘটনা।” আসলে তা নয়। এগুলো একই মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

একটা কারণ হলো ভয় আর অজ্ঞতা। অনেকেই ভাবে, কুকুর মানেই জলাতঙ্কের ভয়, কামড়ে দেবে, তাই আগে ওকে সরিয়ে দাও। অথচ বাস্তবে আজকাল শহর–গ্রামে যে কুকুরগুলো থাকে, তাদের বেশির ভাগই মানুষের ফেলে দেয়া খাবার খেয়ে পেট চালায়, মানুষের ভয়ে নিজেই দূরে থাকে। আমরা যদি ঠিকঠাক ভ্যাকসিন, জন্মনিয়ন্ত্রণ আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে পারতাম, তাহলে সংখ্যাও কমে যেত, ঝুঁকিও অনেক কম থাকত। কিন্তু সেই কষ্টের কাজগুলো না করে আমরা সহজ রাস্তা খুঁজি – “মেরে ফেলো।”

আরেকটা কারণ আমাদের শৈশবের শিক্ষা। ছোটবেলায় অনেকেই দেখেছে – ছেলেপেলে মিলে পাখি মারার খেলা খেলছে, কেউ আবার ইট ছুড়ে কুকুর–বিড়াল তাড়াচ্ছে, বড়রা হেসে বলছে – “বাহ, দারুণ নিশানা!” কখনো কি আমরা বাচ্চাদের বলেছি, “ওটা কষ্ট পাচ্ছে, এভাবে মারবে না”? বরং অনেক বাড়িতেই শোনা যায় – “ওই কুকুরটাকে দুটো লাথি দে তো”, “ওই বিড়ালটা ডাস্টবিনে ঢুকে পড়েছে, লাঠি দিয়ে মার।” শিশুরা দেখে–শেখেই বড় হয়। তাদের কাছে প্রাণীর ওপর নির্যাতন নিত্যকার, স্বাভাবিক একটা “মজা” হয়ে যায়।

এর সঙ্গে আছে আমাদের “ক্ষমতার আনন্দ।” যারা দুর্বল, তাদের ওপর অত্যাচার করে আমরা নাকি নিজেদের শক্তি বুঝি – এমন একটা বিকৃত আনন্দ থেকে অনেক সময় মানুষ অকারণে কুকুর–বিড়ালকে লাথি মারে, মারতে মারতে ভিডিও করে, বন্ধুদের দেখায়। এটা শুধু প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা না, মানবিকতারও ভাঙন।

তবু আশার কথা আছে – ঈশ্বরদীর রাতটা তাই গুরুত্বপূর্ণ

ঈশ্বরদীর ঘটনায় একটা দৃশ্য আমাদের মনে রাখা দরকার। ধরুন, একটা মা কুকুরের কান্নায় প্রথমে কেউই গুরুত্ব দেয়নি। পরে স্থানীয় কিছু মানুষ বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। কারও মোবাইলে ভিডিও গেল, কেউ সেটা সামাজিক মাধ্যমে দিল। সেখান থেকে এক প্রাণি কল্যাণ সংগঠনের কানে এল। তারা দূর শহর থেকে গাড়ি ভাড়া করে ছুটে গেল ঈশ্বরদীতে। তারা একা পারেনি – গিয়ে প্রথমেই তাদের দরজা খুলে দিয়েছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ইউএনও, থানার ওসি। কেউ আবার ফোনে পরামর্শ দিয়েছেন – কোন ধারা ব্যবহার করলে অন্তত মামলাটা দাঁড় করানো যায়, কীভাবে সুরতহাল হবে, মৃত কুকুরছানাগুলোর দেহ সংরক্ষণ করবে কারা, চিকিৎসার ব্যবস্থা কী হবে মা কুকুরটার জন্য।

সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি কতজন মানুষ ঘুরেছেন এক অফিস থেকে আরেক অফিসে – শুধু এই “অকথ্য” প্রাণীগুলোর ন্যায়বিচারের জন্য। কেউ নাম–যশের জন্য নয়, কেউ পুরস্কারের আশায় নয়। অনেকেই জানেন – এই মামলার শেষ পর্যন্ত কী হবে, সেটা কোনো দিন পত্রিকার পাতায়ও না–ই আসতে পারে। তবু তারা করেছেন, কারণ ভেতর থেকে কোনো অদৃশ্য হাত বলে গেছে – “এটা না করলে তুমি মানুষ হিসেবে ব্যর্থ হবে।”

আমাদের দেশে সাধারণত প্রাণীর জন্য এমন একতাবদ্ধ অনুভূতি দেখা যায় না। তাই এই ঘটনা ব্যতিক্রম। এবং ব্যতিক্রম বলে এটাকে আলাদা করে মনে রাখার দরকার আছে। যেন বোঝা যায় – চাইলে আমরা পারি। একটা মা কুকুরের কান্নায় শুধু আবেগী হয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে থেমে না থেকে, আইনের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়াও সম্ভব, যদি সত্যি আমাদের ইচ্ছে থাকে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় – এক–দু’টা জাগ্রত মুহূর্ত কি যথেষ্ট, যদি বাকি সময়টা আমরা চুপচাপ অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি?

এভাবে কুকুর–বিড়াল মরলে আমাদের কী যায়–আসে?

অনেকে হয়তো ভাবছেন, দেশের এত সমস্যা – বন্যা, দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, নারী নির্যাতন – তার মধ্যে কুকুর–বিড়াল নিয়ে এত আলোচনা কেন? উত্তরটা খুব সহজ – যিনি নিরীহ কুকুরের গায়ে লাথি মারতে পারেন, বিড়ালের গলা কাটতে পারেন, পাখিকে আগুনে পোড়াতে পারেন – মানুষের প্রতি তাঁর সহানুভূতিও যে খুব গভীর হবে, তা আমরা ধরে নিতে পারি না।

সারা পৃথিবীর নানা গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু বা কিশোর বয়সে যাদের প্রাণীর ওপর অত্যাচারের অভ্যাস তৈরি হয়, তাদের একটা অংশ বড় হয়ে সহিংস অপরাধের দিকেও বেশি ঝুঁকে পড়ে। কারণ, যখন ভেতরের করুণাবোধ একবার মরে যায়, তখন তা মানুষ–প্রাণী আলাদা করে চেনে না। আজ যদি আমরা চুপ করে দেখি কেউ রাস্তার কুকুরকে মেরে ফেলছে, কাল সে হয়তো কারও শিশুর ওপর হাত তুলবে – সেখানেও আমরা কি চুপ থাকব?

আরেকটি দিক আছে – জনস্বাস্থ্য। কেউ যদি গোপনে বিষ মিশিয়ে পুরো এলাকায় কুকুর–বিড়াল মারতে শুরু করে, সেই বিষ কার পাতে, কোন পুকুরে, কোন শিশুর হাতে যাবে – তার কোনো গ্যারান্টি নেই। আবার সব কুকুর–বিড়াল মেরে ফেললেই জলাতঙ্ক বা রোগ থেমে যায় না, বরং অনিয়ন্ত্রিতভাবে নতুন কুকুর এসে ভিড় জমায়। তাই দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও মানবিক, বৈজ্ঞানিক পথই আসলে নিরাপদ।

আমরা কী করতে পারি – রাষ্ট্রের করণীয়

প্রথমেই দরকার আইনকে সত্যিকারের কার্যকর করা। প্রাণী কল্যাণ আইনে যে ফাঁকফোকর আছে, নীতি–নির্ধারকদের উচিত সেগুলো নিয়ে ভাবা। সাধারণ নাগরিক কেন নিজের চোখে দেখা অপরাধের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করতে পারবেন না? কেন শুধু একটি–দুইটি দপ্তরের হাতে মামলার ক্ষমতা থাকবে? এই ধারা বদলে, অন্তত নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি সংগঠন, অথবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (চেয়ারম্যান, কমিশনার, কাউন্সিলর)–দেরও যদি লিখিত অভিযোগ করার ক্ষমতা দেয়া হয়, তাহলে মাঠে আইনের ব্যবহার অনেক বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রশিক্ষণ দরকার। যারা থানায় কাজ করেন, তারা যদি বুঝে যান – প্রাণী নির্যাতনকে “ধর্তব্যের বাইরে” রেখে দিলে তা ভবিষ্যতে বড় অপরাধেও প্রভাব ফেলতে পারে, তাহলে তাঁরা এটাকে গুরুত্ব দেবেন। পুলিশের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কোর্সে একটা ছোট অংশ হলেও প্রাণী কল্যাণ আইন নিয়ে সেশন রাখা যায় না – এমন কোনো কারণ নেই। একইভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন যারা, তাঁদেরও স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে – বাজারে পশু পরিবহনে অতিরিক্ত নির্যাতন, কোরবানির সময় অযথা পশুকে কষ্ট দেয়া, বাচ্চাদের সামনে নির্মম দৃশ্য – এগুলো যেন চোখ এড়িয়ে না যায়।

তৃতীয়ত, শহর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন দরকার। শুধু নোটিশ ঝুলিয়ে “কুকুরের উপদ্রব বন্ধ করুন” বললেই হবে না। রাস্তার কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে – টিকা দেয়া, নির্বীজকরণ, তারপর আবার একই এলাকায় ছেড়ে দেয়া। এতে করে কুকুরের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে, রোগ–ব্যাধির ঝুঁকিও কমে, আবার এলাকা প্রায় কুকুরশূন্য হয়ে গেলে যে নতুন, অচেনা কুকুর ঢুকে পড়ে – সে সমস্যাটাও কম থাকে। আমাদের বড় শহরগুলো, জেলা শহরগুলো – সবাই মিলে যদি দীর্ঘমেয়াদি এমন একটা পরিকল্পনা নিত, তাহলে “মেরে ফেলাই সহজ” – এই যুক্তি নিজে থেকেই দুর্বল হয়ে যেত।

এছাড়াও, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শক্ত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। খোলা ডাস্টবিন, রাস্তার পাশে উঁচু করে ফেলে রাখা ভাঙারি, খাবারের উচ্ছিষ্ট – এগুলো শুধু কুকুর–বিড়ালকেই টানে না, ইদুর থেকে শুরু করে নানা রোগবাহী প্রাণীকেও টানে। সঠিকভাবে ময়লা ফেলার ব্যবস্থা করলে, খাবারের উৎস কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রাণীর সংখ্যা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে – আবার রোগের ঝুঁকিও কমে।

চতুর্থত, গ্রামাঞ্চলে কৃষি ও পশুপালনে মানবিক মডেল গড়ে তোলা দরকার। প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে – কীভাবে গরু–ছাগল পরিবহন করতে হয় যাতে কম কষ্ট পায়, কীভাবে দড়ি বাঁধতে হয় যাতে গলার শ্বাসরোধ না হয়, কীভাবে বাজারে দিনের পর দিন পানিবিহীন অবস্থায় দাঁড় করিয়ে না রেখে বিক্রির ব্যবস্থা করা যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যেমন মাঠে গিয়ে কৃষকদের শিখায় কীভাবে ভালো ফলন পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরও সেমিনার–প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবিক পশুপালন শেখাতে পারে।

আরেকটা বড় ব্যাপার হলো – স্কুল, কলেজ এর পাঠ্যবই। সেখানে যদি ছোট থেকেই একটা–দুটো গল্প থাকে, যেখানে প্রাণীর কষ্ট, তার অনুভূতি, মানুষের দয়ার মূল্য বোঝানো হয়; নৈতিক শিক্ষা ক্লাসে যদি মাঝে মাঝে আলোচনা হয় – “রাস্তায় আহত একটা কুকুর দেখলে তুমি কী করবে?” – তাহলে ধীরে ধীরে প্রজন্মের ভিতরে অন্যরকম এক বোধ তৈরি হবে।

আমরা কী করতে পারি – সাধারণ নাগরিকের ভূমিকা

রাষ্ট্রের করণীয় অনেক, তবে সব দায় সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে রেখে আমরা নিজেরা নিষ্ক্রিয় থাকলে ছবিটা বদলাবে না। বরং ছোট ছোট কিছু জিনিস প্রতিটি মানুষই করতে পারে।

প্রথমত, নিজের বাড়ি আর সন্তানদের ভেতর মানসিকতা বদলানো। বাচ্চারা যদি আঙিনায় বা রাস্তায় কুকুর–বিড়ালকে পাথর ছুঁড়ছে, হাসছে – তখন ওদের বকাঝকা না করে, ধীরে ধীরে বোঝানো যায় – “ওটারও ব্যথা লাগে।” গল্প বলা যায় – ভিজে বিড়ালটাকে ভাত দিল যে মেয়ে, সে রাতে কী স্বপ্ন দেখল; কুকুরকে লাথি মারতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল যে ছেলে, সে কী শিখল। এসব ছোট গল্প থেকেই মানবিকতার প্রথম বীজ রোপণ হয়।

দ্বিতীয়ত, আশেপাশে খুব নির্মম কোনো ঘটনা দেখলে চুপ না থাকা। এর মানে এই নয় যে, মুহূর্তেই গিয়ে ঝগড়ায় জড়াতে হবে, বা মারামারি করতে হবে। বরং ধীরে–সাবধানে কাজ করতে হবে। আগে বুঝে নিন কী হচ্ছে, কে করছে। নিরাপদ থাকলে ভিডিও বা ছবি রাখতে পারেন, যা পরের ধাপের জন্য প্রমাণ হিসেবে কাজে আসবে। কাছাকাছি থানায় ফোন করে জানতে চাইতে পারেন – “এটা কি অপরাধ নয়?” উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার নম্বর বের করে ওনাকে জানাতে পারেন – এখন অনেক জেলাতেই এসব কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয়।

একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রাণি কল্যাণ সংগঠন এখন কাজ করছে – কেউ ঢাকায়, কেউ জেলা শহরে, কেউ আবার অনলাইনে পরামর্শ দেয়। আপনার এলাকায় যদি এমন কোনো সংগঠন কাজ করে, অন্তত তাদের ফেসবুক পেজ বা হেল্পলাইন খুঁজে রাখুন। কোনো ঘটনায় কীভাবে এগোবেন, কাকে যোগাযোগ করবেন, কাগজপত্রের কী দরকার – এসব বিষয়ে তারা সহায়তা করতে পারে।

তৃতীয়ত, “ভালবাসা মানেই শুধু খাওয়ানো” – এই ভাবনাটা একটু বদলানো দরকার। অনেকেই রাতের অন্ধকারে গিয়ে রাস্তার কুকুর–বিড়ালকে খাবার দেন – এটা খুবই সুন্দর কাজ, তাতে তাদের বেঁচে থাকা সহজ হয়। কিন্তু পাশাপাশি যদি আপনি স্থানীয় কোনো ভেটেরিনারি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে টিকাদান বা প্রজনন নিয়ন্ত্রণের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এলাকার মানুষ আর প্রাণী – দু’পক্ষের জন্যই উপকার হবে।

চতুর্থত, নিজেদের ভুলগুলো স্বীকার করতে শেখা। আগে যদি কখনো রাগের মাথায় লাথি মেরে থাকি, পাথর ছুড়ে মারতে উসকানি দিয়ে থাকি, সেটাকে জীবনের একটা ভুল অধ্যায় ধরে নিয়ে আজ থেকে বদলানো যায়। অন্যকে উপদেশ দেয়ার আগে নিজের ভেতরেই একটু প্রশ্ন করা দরকার – “আমি নিজে কতটা দয়ালু?”

বিজ্ঞান, সংস্কৃতি আর মানবিকতার মিল–মিশ

আমাদের সাহিত্য, লোককাহিনি, ধর্মীয় গল্প – সবখানেই প্রাণীদের চরিত্র অনেকখানি জুড়ে আছে। টুনটুনির গল্প, শিয়াল–কুমির–খরগোশ – শিশুদের প্রথম শেখা নৈতিকতার পাঠের অনেকটাই তো এসব প্রাণীর কাণ্ডকারখানা ঘিরে। অথচ বড় হতে হতে আমরা কীভাবে যেন ভুলে যাই – তারা কল্পকাহিনির চরিত্র নয়, আমাদের চারপাশেও ঠিক তেমন সব জানোয়ার আছে, যারা কষ্ট পেলে আর্তনাদ করে, ভালোবাসা পেলে লেজ নাড়ে।

বাংলা সংস্কৃতিতেও গৃহপালিত গরু–ছাগল, এমনকি কুকুর–বিড়াল, কখনো “বাড়ির সদস্য” বলে ধরা হয়েছে। অনেকে এখনও মরা কুকুর–বিড়ালকে গর্ত খুঁড়ে কবর দেয়, বাচ্চাদের নিয়ে গিয়ে বলে – “ও আমাদের ঘরের প্রাণী ছিল।” এই সব আচার–অনুষ্ঠানগুলোকে তুচ্ছ মনে না করে বরং এগুলো থেকেই আমরা শিখতে পারি – ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীকেও পরিবারের অংশ হিসেবে ভাবা যায়।

যারা আবার আধুনিক বৈজ্ঞানিক মানসিকতার কথা বলেন, তারাও জানেন – প্রাণীদেরও ব্যথা অনুভব করার স্নায়ুতন্ত্র আছে, তারা আনন্দ–ভয়–দুঃখ – এসবও কম–বেশি অনুভব করতে পারে। তাই তাদের ওপর অকারণে নির্যাতন করা মানে অন্ধভাবে নিষ্ঠুর হওয়া। মানবিকতা আর বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ – দুই দিক থেকেই এ ধরনের কাজের কোনো সমর্থন নেই।

শেষ কথাটা সেই মা কুকুরকে নিয়েই

ঈশ্বরদীর সেই মা কুকুরটার কথা মনে করুন। হয়তো সে কোনোদিনও বুঝবে না, কিছু মানুষ তার হয়ে কতটা লড়েছে। সে শুধু জানে, তার বুক ফুলে আছে দুধে, কিন্তু বাচ্চা নেই। যদি ভাগ্য ভালো হয়, স্থানীয় মানুষদের সহায়তায় কেউ তাকে চিকিৎসা করিয়েছে, হয়তো কোনো নিরাপদ জায়গায় রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে তার দুধ কমে যাবে, শরীরের ব্যথা কমবে। কিন্তু তার যে মনটা আরেকবার ভাঙা হয়েছে, আমরা জানি না সেটার দাগ কতদিন থাকবে।

অন্যদিকে যে মানুষটি বস্তায় ভরে সেই আটটা প্রাণকে পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছে, তার কী হবে? আইনগত প্রক্রিয়া চলবে, হয়তো কোনো একদিন আদালতে হাজিরা দেবে, আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। কিন্তু সমাজ হিসেবে আমরা যদি তাকে শুধু “আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী” বলে না দেখে, নিজের ভেতরেও প্রশ্ন না তুলি – “আমি কেন এমন পরিবেশ তৈরি করলাম, যেখানে কেউ মনে করতে পারে, কুকুরছানা মারলে কিছু হবে না?” – তাহলে আসলে আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতাই থেকে যাবে।

সম্পাদকীয় পাতার একটা লেখায় পুরো সমাধান দেয়া সম্ভব না। তবু আমরা অন্তত কিছু পরিষ্কার কথা বলতে পারি –

প্রাণীকে নির্যাতন করা বাংলাদেশের আইনে অপরাধ। রাস্তার কুকুর–বিড়ালও এই আইনের বাইরে না। এসব ঘটনার বিচার কঠিন – কারণ আইনে ফাঁকফোকর আছে, জনবল–সীমাবদ্ধতা আছে, সামাজিক উদাসীনতা আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব।

যেদিন কোনো পাড়ায় কেউ আর সাহস করে বিড়ালের গলা কাটতে পারবে না, কারণ জানে – আশেপাশের মানুষ চুপ থাকবে না; যেদিন থানার ডিউটি অফিসার বলবেন – “কুকুরের ব্যাপার বলে কথা নয়, এটা তো নির্যাতনের মামলা”; যেদিন স্কুলের বাচ্চারা বেড়াতে গিয়ে আহত কুকুর দেখে নিজেদের মধ্যে টাকা তুলে ভেটেরিনারি ডাক্তার ডেকে আনবে – সেদিন আঁচ করা যাবে, আমরা সত্যিই একটু বদলেছি।

মানবিক বাংলাদেশ মানে শুধু সড়কে শৃঙ্খলা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, ডিজিটাল বা স্মার্ট শব্দের ঝড় না – মানবিক বাংলাদেশ মানে এমন একটা দেশ, যেখানে সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে অবলা জীবটাও জানে, কেউ না কেউ তার কান্না শুনবে। ঈশ্বরদীর সেই মা কুকুর অন্তত আমাদের সেই প্রশ্নটা করে দিয়ে গেছে – আমরা কি এমন একটা দেশ গড়তে রাজি, যেখানে তার ছানার জীবনও মূল্যহীন হবে না?