এক সন্ধ্যা (ছোট গল্প)

বিশাল বিশাল দালান হয়েছে শহরে । আভিজাত এলাকায় বাড়ি-ঘর বেড়েছে ঠিকই । কিন্তু শহরের কিছু কিছু রাস্তা ,গলি ,সব আগের মতোই আছে । কিছু বদলায়নি । সাধারন একেকটা রাস্তা । দিনের দুপুরে কিছু বোঝা যায়না । তবে দিনের আলো যত কমে ,  রঙিন হতে থাকে রাস্তা গুলো । রাত বাড়ে , বাড়ে আদিম নেশা । বাড়িগুলিতে জানালা আছে । ছোট ছোট জানালা । বাইরের বাতাস আসেনা ঐ জানালা দিয়ে । আসেনা সূর্যের আলো , না আসে চাঁদের । সন্ধ্যার পর থেকে জানালা গুলি দিয়ে গাঢ় মেকাপ করা চেহারা বের করে বসে থাকে মেয়েগুলো । সামনে দিয়ে যাওয়া প্রত্যেকেই তাদের কাছে খদ্দের । এরা টাকা দিয়ে ভালোবাসা কিনতে আসে । মনের না , শরীরের । কত জায়গার লোক আসে এখানে । বেকার , জুয়ারি , মাতাল , ড্রাইভার থেকে শুরু করে উচু সমাজের কোট প্যান্ট পড়া ফুলবাবু । কেউ বাদ নেই । আসে ঘরের ঐ বৌ এর প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া স্বামী । আসে কলেজ ভার্সিটি পড়ুয়ারাও । রাতের পর রাত , একই ছক বাঁধা নিয়ম সব গুলা ঘরের ।

এই গলিরই শেষ বাড়িটার দোতলায় রীনা থাকে । তেইশ কি চব্বিশ বছর বয়স হবে । এই গলিতেই জন্ম তার । বাবার পরিচয় পায়নি কখনও । গলি থেকে বাইরে যাওয়া হয়নি কখনও । তার মতো আরও অনেকেই আছে এখানে । গালি দিয়ে যাদের বলা হয় জন্মের ঠিক নাই । এব্যাপারে কোনও আক্ষেপ নেই রীনার । ছোট বেলা থেকেই জেনে এসেছে সে , পুরুষ মানেই খদ্দের , পুরুষ মানেই লোভী । এই এত বছরে হাজারটা পুরুষের সামনে নগ্ন হতে হয়েছে তাকে । এক জনের পর এক জন । রাতের পর রাত । সকালে ক্লান্ত শরীর নিয়ে এলিয়ে থাকে বিছানার উপর । ক্লান্তিতে ঘুম আসে ঠিকই , কিন্তু ঐ ঘুমের মধ্যে কোনও স্বপ্ন আসেনা । স্বপ্ন দেখার অধিকার নেই রীনাদের ।

এক বিকালে বাসার সামনে গিয়েছিল রীনা । চাল কিনতে । সারাদিন ঘুমিয়ে কাটিয়েছে । শরীরটা কিছুদিন ধরে ভালো যাচ্ছে না । দোকান থেকে পাঁচ কেজি চাল কিনলো সে । কাগজের বড় প্যাকেটে ওজন করে দিল দোকানদার । ঠিকঠাকই ছিল সব । বাসার ঠিক সামনে গিয়েই ঘটলো বিপত্তি । দুর্বলতার জন্য মাথা হঠাৎ চক্কর দিয়ে উঠলো তার । কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাত থেকে পড়ে গেল চালের প্যাকেট । বাসার সামনে হওয়াতে আশে পাশের পরিচিত চেহারা গুলি দেখতে পেল সে , তার সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছে । শুধু একটা চেহারা চিনল না সে । বাচ্চা একটা ছেলে । মানে তার থেকে ছোট বয়সে । আঠারো উনিশ বছর । কাঁধে একটা ব্যাগ । কলেজে পড়ে মনে হয় । বড়জোড় ভার্সিটির প্রথম বছরের ছাত্র হতে পারে । চিকন । একটু বেশীই চিকন । ছেলেটার চোখ দুইটা শুধু আলাদা । বাকি সবার থেকে আলাদা । নীল নীল । ছেলেটা এগিয়ে এলো , আর রীনার হাত ধরে উঠালো । রাস্তার মধ্যে একটা মেয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে , এটা দেখে সবাই এগিয়েছিল ঠিকই । রীনা দাড়ানোর পর কেউ কেউ তার গায়ে হাত দিয়ে লেগে যাওয়া মাটি পরিষ্কার করতে থাকলো , সুযোগে ছুঁয়ে দিলো শরীরের কিছু জায়গা । এগুলো ভালই বুঝে রীনা । ঝটকা দিয়ে লোকদের সরিয়ে পড়ে যাওয়া চালের প্যাকেটের দিকে এগিয়ে গেলো সে । সাথে ঐ নীল চোখের ছেলেটাও সাহায্য করলো । প্যাকেট থেকে পড়ে যাওয়া চাল গুলি দুইজনে মিলে উঠালো । তারপর প্যাকেটটা নিজের হাতে নিয়ে রীনার সাথে বাসার দরজা দিকে গেলো । রুমের দরজার তালা খুলে রীনা আগে ভিতরে ঢুকলো , ‘ভিতরে আসো ? কষ্ট করলে অনেক । কিছু খাবে ? পানি ? শরবত ?’ ফেরত এসেই ছেলেটার দিকে এক গাদা প্রশ্ন ছুড়ে দিল রীনা । ছেলেটা আমতা আমতা করছিলো দেখে রীনা বললো , ‘ভয় করছে ভিতরে আসতে ? কি ভাবছো ? নোংরা হয়ে যাবে ভিতরে আসলে ?’

‘না , ভয়ের কি আছে ?’ এই প্রথম মুখ খুললো ছেলেটা । ‘এখানে একা থাকো ?’

‘ হু ‘ , রীনা অবাক হয়েছে, তাকে ছেলেটা তুমি বলে ডাকছে দেখে ।

‘ তুমিও এখানে বাকিদের মতো উল্টা পাল্টা কাজ করো ?’ ঘরের এদিক ওদিক দেখতে দেখতে বলে ছেলেটা ।

প্রশ্ন শুনে হাসে রীনা । ‘যেসব জায়গায় উল্টা পাল্টা কাজ হয় , সেসব জায়গায় আসো কেন ?’ পাল্টা প্রশ্ন করে সে ।

‘আমি এমনি এসেছি , আমার এক বন্ধু প্রায়ই আসে এখানে । আজকে আসার সময় জিজ্ঞেস করলো তার সাথে যাবো নাকি , চলে আসলাম । ‘ বলতে বলতে বিছানার এক কোনায় বসে ছেলেটা । কাঁধের ব্যাগটা বিছানার পায়ের কাছে নামিয়ে রাখে ।

রীনা অবাক হয় । একটা ছেলে তার রুমে বসা , তার বিছানায় বসা , তাও রীনার দিকে না তাকিয়ে পুরোটা রুমে শুধু নজর বুলাচ্ছে । অন্য যত জনই এখানে এসেছে , এমনভাবে তাকাতো , যেন চোখ দিয়েই খেয়ে ফেলবে । কিন্তু এই ছেলেটা আলাদা । চেহারার মধ্যে একটা মায়া মায়া ভাব আছে । ‘কি নাম তোমার ? কোন কলেজে পড়ো ? ‘ রীনা ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে ।

‘আমার নাম অনিক । কিন্তু বন্ধুরা অনির্বাণ ডাকে ‘ ছেলেটা উত্তর দেয় ।

‘অনির্বাণ ? এটা আবার কেমন নাম ? ‘ অবাক হয় রীনা ।

‘আয় হায় , তুমি অনির্বাণকে চিনোনা ? ও হল নচিকেতার বন্ধু । এখন বলো , নচিকেতাকেও চিনোনা ?’ ভ্রু কুচকে উত্তরের অপেক্ষা না করে বলতে থাকে অনিক , ‘অনির্বাণ নচিকেতার ভার্সিটির ফ্রেন্ড ছিল । গরীবদের জন্য বড় কিছু একটা করার জন্য বাড়ি ঘর ছেড়ে গ্রামে চলে যায় সে । ছেড়ে দেয় তার বান্ধবীকেও । অনেক বছর পর সে গ্রাম থেকে তাঁর বান্ধবীকে চিঠি পাঠায় । সেই চিঠিতে লেখা ছিল, অনির্বাণ মেয়েটাকে অনেক ভালোবাসে , তাকে বিয়ে করতে চায় , কিন্তু তার আগে গরীবদের জন্য কিছু করতে চায় সে , তার সাথে ঘর বাঁধার আগে গরীবদের জন্য একটা ঘর বানাতে চায় সে ‘ ।

একটানা কথা বলে কিছুক্ষন থামে অনিক । ওদিকে রীনা চুপ হয়ে শুনছে এই ছেলের কথা । ‘তো চিঠির কথা গুলি সাজিয়ে নচিকেতা একটা গান লিখে । খুব হিটও হয়েছিল গানটা । ঐ গানের নাম অনির্বাণ ‘ বলে অনিক ।

‘বুঝলাম , কিন্তু তোমাকে তোমার বন্ধুরা অনির্বাণ ডাকে কেন ? তুমিও বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলে নাকি ? গরীবদের জন্য ?’ মুচকি হেসে রীনা জিজ্ঞেস করে ।

‘আরে না , কাউকে সাহায্য করতে চাইলে বাসা ছাড়া লাগে নাকি । আসলে অনির্বাণ গানটা আমি বন্ধুদের সামনে গুনগুন করতে করতে পুরো পচিয়ে ফেলেছি । বন্ধুরা তাই আমাকে অনির্বাণ ডাকে , আর অনির্বাণের চোখের রঙ আর আমার চোখের রঙ সেইম টু সেইম , দ্যাখো ‘ বলে রীনার একটু সামনে এসে চোখ বড় বড় করে দেখায় অনিক ।

হেসে উঠে রীনা । আজব একটা ছেলে । পুরো বাচ্চামি দিয়ে ভরা । পতিতালয়ে বসে চোখের রঙ দেখাচ্ছে ।

‘ ওহ , বাই দ্যা ওয়ে , আমি কলেজে পড়িনা , কলেজ পাশ করেছি দুই বছর আগে , অনার্সের স্টুডেন্ট আমি , সেকেন্ড ইয়ার ‘ রীনার আগে করা প্রশ্নটা এতোক্ষনে মনে পড়েছে অনীকের ।

‘আচ্ছা , তুমি তাহলে গান গাও ?’ প্রসঙ্গ পাল্টায় রীনা ।

‘ না, না’ মাথা নাড়ায় অনিক , ‘ আমি গাইতে পারিনা । এমনি বাথরুম সিংগার আমি । কিন্তু আমি অনেক গান শুনি।’ আবারো গড়গড় করে বলতে থাকে অনিক , ‘আসলে আমার গান শোনার অভ্যাস অনেক ছোটবেলা থেকে । আম্মু ঐসময়ে ক্যাসিওর বিশাল একটা ক্যাসেট প্লেয়ারে বিভিন্ন শিল্পীর গান ছাড়তো । সুবীর নন্দী , মান্না দে , লতা , আব্দুল হাদী আরও অনেকের গান শুনতো একটার পর একটা । আর কাজ করতো । ছোটবেলা থেকে এতো ওল্ড মডেলের গান শুনতে শুনতে বড় হয়েছি আমি , আমার কোনও বন্ধু এতো আগের গান চিনবেনা ‘ ।

‘হুম , বুঝলাম , খাবে কিছু ? ‘ প্রশ্ন করতে করতে উঠে দাঁড়ায় রীনা । বাইরে আলো কমে এসেছে । রাস্তার আশে পাশে লোকের হাটাহাটি বেড়েছে । আরেকটা রাত শুরু হচ্ছে ।

‘ না , কিন্তু একটু আগে যে শরবতের কথা জিজ্ঞেস করলে , শরবত খাওয়াতে পারো । আপত্তি নাই আমার ‘ হাসি মুখে বলে অনিক ।

মাথায় হাত দেয় রীনা , ‘আমিতো এমনি বলার জন্য বলেছিলাম , ভেবেছিলাম তুমি না বলবে । ‘ হাটতে হাটতে সামনের একটা টেবিলের নিচে ঝুকে যায় সে । একটা কাচের হরলিক্সের বোতল বের করে । ভিতরে টোস্ট বিস্কুট আছে কিছু । বোতলের মুখটা খুলতে খুলতে অনিকের হাতে দেয় সে । হাত বাড়িয়ে বোতল টা নেয় অনিক ।

রাস্তার কোনও একজায়গা থেকে মোটামুটি অনেক জোরে একটা গানের শব্দ ভেসে আসছে । গান বললে ভুল হবে , কোনও গানের সুর ভেসে আসছে , আর আসছে ড্রামের আওয়াজ । রঙিন হচ্ছে সন্ধ্যা । বিছানার এক কোনায় , কাঠের উপর এক হাত দিয়ে তালে তালে আওয়াজ করা শুরু করলো অনিক । ‘তুমি গান পছন্দ করোনা ? ‘ রীনাকে জিজ্ঞেস করে সে।

‘করি , কিন্তু যেসব গান আমি শুনি তা তোমার ভালো লাগবেনা । আমি বড্ড সেকেলে । ‘ মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে উত্তর দেয় রীনা । ভালোই লাগছে তার । জীবনে হয়তো এই প্রথম কোনও ছেলের সাথে এতক্ষণ কথা বলছে সে । কথা বলছে আর অবাক হচ্ছে সে , ছেলেটা একবারও রীনার পেশা নিয়ে কোনও কথা উঠায়নি । কোনও খারাপ ইঙ্গিতও করেনি । ভালোই লাগছে তার কথা বলতে । আজকে তার নিজেকে মানুষ মনে হচ্ছে । কোনও ছেলে যে তার সাথে বসে কিছুক্ষন গল্পও করতে পারে , জানা ছিলনা রীনার।

‘ঠিক আছে , ভালো লাগবে কি না পরের কথা , আগে শুনি কি ধরনের গান পছন্দ তোমার ? ছ্যাঁক খাওয়া গান ? না রোমান্টিক গান ? ‘ বলে আনিক ।

‘ছ্যাঁক খাওয়া গান ? সেটা আবার কি ?’ রীনা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে ।

‘আরে , ছেলে পেলে গার্লফ্রেন্ডের সাথে লাইন মারার সময়ে ফুর্তিতে যে গান শুনে , সেগুলো রোমান্টিক গান । আর প্রেমে ছ্যাঁক খেলে বা বিয়ের পর ডিভোর্স হয়ে গেলে যে গান শুনে ,সেগুলো হলো ছ্যাঁক খাওয়া গান । বুঝলা ? তো , কোন গান পছন্দ তোমার ? ‘

অনিকের কথা শুনে জোরে শব্দ করে হাসতে থাকে রীনা , ‘ গানের ধরন তো বুঝিনা , তবে একটা গান প্রায়ই শুনি , শুনবে ?’ বলে বিছানার পাশে রাখা টুলটার দিকে হাত বাড়ালো সে । টুলের উপর ছোট কিছু একটা ঢাকা আছে কাপড় দিয়ে । কাপড়টা সরিয়ে দিল সে । একটা মিনি ক্যাসেট প্লেয়ার । দুইপাশে দুইটা ছোট ছোট স্পিকার লাগানো । ক্যাসেট ভিতরে আগে থেকেই দেয়া ছিল । রীনা শুধু প্লে সুইচটা চেপে দিল । ওর দিকে তাকিয়ে আছে অনিক ।

শুরু হলো একটা গান, সুর শুনেই মাথা দুলাতে লাগলো অনিক , আর বিড়বিড় করে ক্যাসেট প্লেয়ারের সাথেই গাইতে লাগলো  ‘বড় সাধ জাগে , একবার তোমায় দেখি ‘ । রীনা অবাক । এই ছেলে আসলেই গান পাগল ।

‘জানো ? এই গানেরও একটা গল্প আছে । আমি অনেক আগে কার কাছে জানি শুনেছিলাম , মনে নাই ।’ বলে অনিক।

‘ধুর , গানের আবার গল্প কি ? ‘ প্রশ্ন করে রীনা ।

‘আছে আছে , প্রত্যেকটা গানের গল্প থাকে ‘ দুই পা বিছানায় উঠিয়ে আসন করে বসে আগ্রহ নিয়ে বলতে থাকে অনিক , ‘এই গানেরও গল্প আছে ‘

‘তাই পন্ডিত ? শুনি কি গল্প ?’ বোতল থেকে একটা টোস্ট বিস্কুট বের করতে করতে বলে রীনা ।

‘হুম , বলছিতো ‘ বলা শুরু করে অনিক , ‘এই গানটা কার লেখা জানো ?’

মাথা নাড়ায় রীনা ।

আবার বলে অনিক , ‘পুলক বন্দ্যোপধ্যায়ের লেখা গান। তিনি অনেক বিখ্যাত কয়েকটা বাংলা গান লিখেছেন। তার একটা গান ছিল – “কে প্রথম কাছে এসেছি” গানটা প্রচারের পর অনেক অনেক অভিনন্দন পেলেন পুলক বন্দ্যোপধ্যায় । একদিন তাঁর একজন মহিলা অনুরাগী অর্থাৎ ফ্যান তাঁকে ফোন দিলেন । খুবই নাকি আবেগ মেশা ছিল ঐ কন্ঠে । এরপর থেকে রোমান্টিক কোনো গান হিট হলেই সেই মহিলা তাঁকে ফোন করতেন। কিন্তু কখনো নিজের নাম ঠিকানা বলতেন না। তার কিছুদিন পর পুলক বন্দ্যোপধ্যায়  লিখলেন আরেক কালজয়ী গান, “এক বৈশাখে দেখা হল দুজনায়/ জষ্টিতে হলো পরিচয়” , শুনেছো না গানটা ? ‘ গল্প বলতে বলতে জিজ্ঞেস করে অনিক ।

‘ হ্যা , শুনবোনা কেন? আমার অনেক পছন্দের গান এটা ‘ , বলে বাকি গল্প শোনার জন্য আগ্রহ নিয়ে  অনিকের দিকে তাকায় রীনা ।

‘তো , এই গানটা প্রচারের পর পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আবার সেই মহিলার ফোন আসে । তিনি ফোনে বললেন, আজ বিকেলে ঠিক সাড়ে পাঁচটায় আমি অমুক জায়গায় এই রঙের শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে থাকবো, আপনি আসুন। আপনাকে দেবো আমার লাগানো গোলাপ গাছের প্রথম ফোটা গোলাপ।’ বলতে থাকে অনিক , ‘ফোন পেয়েতো খুব পুলকিত পুলক সাহেব । এরপর তিনি গাড়ি মুছলেন, রেডি হলেন। তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন। এমন সময়ে ফোন বাজল। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলা।তিনি পুলক কে বললেন , ঠিক পাঁচটায় তাঁর কাছে আসতে । প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আসবেন, পূজার গান ঠিক করতে হবে । অনেক চেষ্টা করেও পুলক কাজটা এড়াতে পারলেন না। তাকে যেতেই হলো। তারপরে মন খারাপ করে সারা রাস্তা গাড়ি চালাতে চালাতে নতুন গানের কথা গুলি ভাবতে থাকলেন তিনি । হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাসায় পৌছে বসে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখে ফেললেন, -বড় সাধ জাগে/ একবার তোমায় দেখি/কতদিন দেখিনি তোমায়। যেটা গেয়েছিলেন প্রতীমা বন্দ্যোপাধ্যায়।’ বলে কিছুক্ষন থামে অনিক ।

‘আহারে , তখনতো মোবাইল ও ছিলনা , থাকলে ঐ মহিলা ফ্যানকে জানাতে পারতো , তাইনা ? এরপর কি হল ? ঐ মহিলার সাথে পড়ে দেখা হয়নি ওনার ?’ মন খারাপ করে জিজ্ঞেস করে রীনা ।

‘ এরপরে ? ‘ মুচকি হেসে বলতে থাকে অনিক , ‘যা হবার তাই হয়েছে , গান সুপারহিট , কিন্তু ঐ মহিলা আর কখনও ফোন দেয়নি পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় কে । বুঝলে ? সব গানের গল্প থাকে  ‘

‘হুম , মনটা খারাপ করে দিলে পুরো ‘ বলে রীনা ।

এমন সময়ে সামনের দরজা দিয়ে একটা ছেলেকে উকি মারতে দেখে উঠে দাঁড়ায় সে , অনিকও নামে বিছানা থেকে ।

‘আরে , হয়েছে তোর ?’ বলতে বলতে বিছানার পাশে থেকে নিজের ব্যাগটা উঠিয়ে দরজার দিকে আগায় সে । ‘ ও আমার বন্ধু , যার সাথে এখানে এসেছিলাম’ রীনাকে মাথা ঘুরিয়ে বলে অনিক । অনিককে আসতে দেখে ঐ ছেলেটা দরজার কাছে থেকে সরে সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ।

‘আমি আসি , ভালো থেকো, টাটা।’ রীনার দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলে অনিক , তারপর দরজার বাইরে চলে যায় ।

হাত দিয়ে শুধু বিদায়ের ইশারা দেয় একবার রীনা । তারপর ক্যাসেট প্লেয়ারটা চালু করে এগিয়ে যায় দরজার সামনে, দাড়িয়ে চৌকাঠে হেলান দেয় । ভাবছে , জীবনে প্রথম কোনও ছেলে তাকে বললো , ভালো থেকো ।

পিছনে ক্যাসেট প্লেয়ারে গান বাজতে থাকে , বড় সাধ জাগে / একবার তোমায় দেখি